ফাহমিনা নূর’র কবিতা গুচ্ছ

 


লেখক পরিচিতি: 

ফাহমিনা নূর। জন্ম ১৬ মে ১৯৭০, ঢাকায়। 
বেড়ে ওঠা এবং বসবাস চট্টগ্রামে।  
লোক প্রশাসনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। 
পেশা শিক্ষকতা। 

কবিতা
ফাহমিনা নূর

বাঁধ প্রকল্প

একটা নদীমানুষ এসেছে এলাকায়-
পাড়াতো কুকুরগুলো তাকে চিনতে পারে না,
চিৎকার করে খুব।

একটা নদীমানুষ হেঁটে যায়,  
কোনো দরজায় কড়া না নেড়েই সে চলে যায়।
নদীমানুষ কেন এসেছিলো কেউ জানে না, 
নদীমানুষকে কেউ ভুলতে পারে না।

সেই থেকে 
সবার মগজে বাঁধ প্রকল্প চালু হলো।

হলুদ

ওরকম একটা ভেজা পথ, 
বর্ষার ক্রন্দন শেষে
একটা ভেজা পথ মাড়িয়ে
নিঃশব্দে হেঁটে গেছে 
পলাশ আর শিমুলের ডাল
কোথাও বসন্ত রাঙাবে বলে।

কথা ফুটছে ওখানে 
প্রেম আর অপ্রেম
দ্রোহ আর বেদনার কথা;
কিছু কথা অস্ফুট, 
ঝুলে থাকে পলাশের ডালে। 

স্রোত ভাসিয়ে নিচ্ছে দুর্বোধ্য ধ্বনি
খলবলে স্রোত 
বলছে- কৈবর্তদের আঁশটে গ্রাম
পলাশের রঙে ধূসর দেখায়;
চেখের ছানিতে বসন্ত রাঙে নি
হলুদ এখানে পান্ডুর অসুখের নাম।

বিভ্রম

একটা নদী এঁকে-বেঁকে ঢুকে পড়েছে 
ফতুয়ার পকেটে 
অথচ
ফতুয়াতে কোনো পকেটই ছিলো না।
এই যেমন
চুক্তিভঙ্গের দলিল নিয়ে 
নীল সারস এসে সামনে দাঁড়ায় 
আর বসার ঘরে নামে জলেশ্বরীর স্রোত।

জানালা খুললেই চতুর্দশী চাঁদ-
এমন পাগল করা জোছনা কেন নামে 
পাহাড়ের গায়ে গায়ে? 
সেই প্রশ্নের উত্তরে দিশেহারা 
এক মাথা এলোচুল এলিয়ে নামে ঝড়
একটা কালো গোলাপ ভায়োলেট রঙ ছূঁয়ে
ছিটকে পড়ে অনতিক্রম্য দূরত্বে 
ইথারে ভাসতে থাকে তার কন্ঠস্বর।

কোথাও জলধি নেই

একটা লাল ট্রগন 
চলে যাচ্ছে অরণ্য পেরিয়ে
পায়ের নিচ হতে সরে যাচ্ছে সপ্তম ঋতু
ডালপালা এগিয়ে ধরে পত্রপতনশীল বৃক্ষ
ফিরে তাকানোর প্রত্যাশায়;
প্রস্থানের গল্পগুলো এমনই, যেন মৃত্যু।

মস্তিষ্ক এক বিষণ্ণ এক্যুরিয়াম 
ভেতরে অসংখ্য খুদে স্কুইডের সমাহার;
থলের ভেতর দুলছে সমুদ্র,
কর্মব্যস্ত মৎস-শিকারীদের বিশাল রাজ্যপাট-
পাখির রাজত্বে দই ও হলুদ মাখানো
মাছের জীবনও প্রশংসার দাবীদার।

দূরে মেঘ ডাকছে, 
হুড়মুড় করে ভাঙছে আকাশ 
কোথাও জলধি নেই, আছে যতটা শব্দের হুঙ্কার;
মাছবৃষ্টির গল্প শুনে বড় হচ্ছে চিন্তাক্ষেত্র
চারপাশে তার নির্মম বিচ্ছুরণ;
ছয় পা'য়ে চিন্তা ছোটে এক ঢেউ থেকে অন্য ঢেউয়ে
সাগর-সোঁদা গন্ধকে আড়াল করে জলের কাঁটাতার।

পুত্রশোক

কেন যে মাঝরাতে 
মৃত সন্তানের কথা ভেবে 
ডুকরে ওঠে মা মাছ!  
  
পদ্মাসেতুর তল থেকে 
পয়সা কুড়িয়ে এনে 
কিনে দিতে চাই পুরোটা নদী। 

জীবনতো পেছন ফিরে চায় নি
তবুও বাতাস বারবার ভারী হয়।
উরুবেয়ে নেমে আসে 
জরায়ু ছেঁড়া স্রোত, নিরবধি।

দোআঁশলা মাটিতে ক্রমশ 
মিশে যাচ্ছে রুহের পানি।
একটা ম্লান আলো হাসে স্মিত, 
সান্ত্বনার মত একটা দোলক;

তবু কেন যে সে এত কাঁদে! 

মাছেরা কাঁদছে নিভৃতে, 
তাই তো নদীতে এত আলোড়ন!
বধির পৃথিবী বলছে- 
মাছের মায়ের আবার পুত্রশোক!

কবিতা।।ফাহমিনা নূর
ওয়াকিং ডিসট্যান্স।।এপ্রিল, ২০২১




অরণ্য পাল’র কবিতা



অরণ্য পালের জন্ম ১৯৯৬ সনের ৪ঠা মে, গড়াই নদী বিধৌত কুষ্টিয়া জেলায়। শৈশবে সাত বছর বয়সে সবার অগোচরে লুকিয়ে প্রথম কবিতা লেখা। 

 

"আমার সকল কবিতাই আমার সামগ্রিক যাপনের রূপান্তর।  কিঙবা কবিতা একটি মাধ্যম যার মধ্যে দিয়ে  নিজেকে অধিক প্রকাশ করতে সক্ষম হই।  অস্তিত্বের নিভুনিভু ছায়াপথের সমান্তরালে আছে কবিতার স্বতন্ত্র এক ঘোরের জগৎ।"

 

তবে তিনি গদ্য এবং চলচ্চিত্রেও আগ্রহী। অরণ্য কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে অধ্যয়নরত।


কবিতা
অরণ্য পাল


ঠোঁট 

 

 

তুই কী গোলাপি ঠোঁটের তোতা পাখি,

কাঁধে বসে গান শোনাবি ? 

 

 

ও স্বর্গীয় তোতা-

           কথা বোলো ঈশ্বরীর ভাষায়

সে কথা ঘোর মগ্ন চুম্বনের কবিতা

 

 

তবু উড়ে এসে কবির কাঁধে বসে ওর

বাহারি পালকের অপেক্ষা…

            

 

ঠোঁট ২

 

 

কাঁধে বসে গান শোনায়

               কথা বলা তোতা

আহা! সে যে আমার কল্পনা…

 

 

 

সুইসাইড নোট 

 

 

শুয়ে থাকি অস্ফুট  কুঁড়ির মধ্যে

পাপড়ির গান শুনে 

                গোলাপ হয়ে ফুঁটি

 

 

গোলাপ কী এক গভীর আলিঙ্গন ?

তোর কোটি বছরের অপেক্ষায়

                       গাঢ় হলে লাল

নিজ পাপড়ির সাথে কথা কই… 

 

 

তবু আমি যেন চাইলেই না ফুঁটে

ফের বুজে যেতে পারি!


            


                    


কবিতা।।অরণ্য পাল

ওয়াকিং ডিসট্যান্স।।এপ্রিল ২০২১



 



            


আহমেদ মওদুদ’র কবিতা: ধানসূত্র


লেখক পরিচিতি আহমেদ মওদুদ। জন্ম: ১৯৮১ সালে। রংপুরের মাহিগঞ্জে। প্রকাশিত বই: ৭টি। কবিতা: ৩টি, কিশোর উপন্যাস:২টি। জীবনী: ১টি। গবেষণা: ১টি। পেশা: শিক্ষকতা কবিতা আহমেদ মওদুদ ধানসূত্র
য.
বসন্তে সন্তের মতো নিরুত্তাপ শ্যামল চাষি, বসে আছেন শিমুলের শেকড় ঘেঁষে। অদূরে ধানের ক্ষেত, ক্ষত ঢেকে রেখেছে নিজের, ঝরে পড়া, আরক্তিম শিমুলের পাপড়ি দিয়ে। চাষিও নিজের ক্ষত, অক্ষত যা যুগ যুগ ধরে; ধান ক্ষেত দিয়ে, ধান দিয়ে ঢেকে রাখার বাসনা নিয়ে বসে আছেন বসন্তের দীঘল দুপুরে, শিমুলের তলে। তলে তলে তার হৃদয় জুড়ে দগদগে ঘা, শিমুলের পাপড়ির মতো, টকটকে লাল, পলাশের পাপড়ির মতো বেসামাল আর কুচি কুচি। পলাশের ডালে বসে যে কোকিল অবিরত ডেকে যায় আর যাকে তোমরা করুনা করে বলে থাক গান, তা তুরীয় স্বর, বসন্তে সন্তের পরিভাষা ।

Ahmed Moudud sent Yesterday at 7:14 AM

র.
ধূলিধূসরিত ঋতুর সাথে, ধূসর চুলের এক চাষি, আজন্ম বয়ে চলা ধানের স্মৃতি মেলাতে গিয়ে বিস্মৃতির ধার ধারলেন। ধান থেকে ধূলি না কি ধূলি থেকে ধান, ম্লান হৃদয় তার মেলাতে পারেনা তবু এইসব জটিল জিজ্ঞাসা। আশা তার হয়না ধূসর, স্বর বাঁধা ধূলির আস্তর ধানের পাতার প্রিয় স্মৃতি, যেভাবে প্রিয় ব্যাঙ ডাকা রাত আর পাখি ডাকা ভোর বসন্তে চাষির । সবুজ ধানের গোছাও বসন্তে চাষি ভালোবাসে। ভালোবাসা সবুজ রঙের; চাষির মতো কে আর জানে! চাষিতো জানে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে ধানে ধানে।
ল.
ঝরে যাওয়া পাতার মতো, ঝরে যায় চাষির আয়ু বসন্তের মৌন বাতাসে। বাতাস, বসন্তে বয়ে যায় ধানের ক্ষেতের কোল ঘেঁষে, ঘসির গন্ধ গায়ে মেখে, হাতের স্পর্শ পাওয়া গো-মল। গোবরতো তার ঐশ্বর্য দিয়ে বাতাসকে ধুয়ে দেয়, নুয়ে দেয় উর্বরতা ধানের ক্ষেতে। ক্ষত কিছু সারে কি তাতে, বসন্তের চিরন্তন সন্তের! সন্তানের মতো যে আগলে রাখে কচি কচি ধান, ধনের উত্তাপ। সন্তাপ তবু অক্ষত থেকে যায় আর আয়ু বাড়ে আয়ু কমে বসন্তে বসন্তে নির্লিপ্ত চাষির ।
কবিতা।।আহমেদ মওদুদ ওয়াকিং ডিসট্যান্স।।এপ্রিল ২০২১


Ahmed Moudud sent Today



সত্যজিৎ রজক -এর কবিতা গুচ্ছ













সত্যজিৎ রজক বায়োগ্রাফিতে লিখেছেন: জন্ম -১৯৯৬  সালে ৫ জুন । আমি পুরুলিয়া জেলার ভাগাবাঁধ গ্রামের বাসিন্দা (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)। বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এ পড়াশোনার সাথে সাথে একটু আধটু লেখালেখি করি এবং ‘প্ল্যাটফর্ম’ পত্রিকা সঙ্গে যুক্ত আছি । পত্রিকার সঙ্গে থেকে কাজ করতে ভালো লাগে তাই। এছাড়াও অনেক ছোট ছোট কাগজে ছাপানো পত্রিকা এবং ওয়েবম্যাগাজিন এ লেখা লেখি করি।


দাঁড়ের পাঁজর গুচ্ছ

সত্যজিৎ রজক


এক.

নিবন্ধের জরায়ু থেকে ঘনীভূত হোক বিপ্লবের মেঘ


খিদে পেটের সংবাদ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ুক আবহাওয়া দপ্তর


কিছু প্রভূত কৃতজ্ঞতা স্বীকার – জন্মান্ধ আঁধারের গানে আলো আসুক!


আর আপনিও চোখে চোখ মিলিয়ে কথা বলার ভূমিকা পালন করুন।


দুই.

এই উন্মাদ দেশ আমার ছিনিয়ে নেওয়া গান

 

শিশিরের ডগায় তাজা সকালের মৃতদেহ ঢাকা দিয়ে রাখে!


আমি অচ্ছুৎ এক ভ্ৰষ্ট বিচার, গায়ে মেখে নিচ্ছি কতকটা নতুন ছাই, 


আর সভ্যতার বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বেরকরে আনার চেষ্টা করছি বাদকের সুর!


তিন.

অন্ধকার জলে ঢিল ছুঁড়ে দেখো, কতটা গভীরে তোমার দেশ!


আর কতটা স্বাধীনতা পেতে চাও? আর কতটা পেলে জেগে উঠবে অধিকার বোধ?


আমি ফুলকে জন্ম দিইনি ঠিকই, তবে ফুলকে ভালোবেসেছি অনেক।


আমার জানা নেই আর কতটা দুঃখ পেলে, আগামী দৌড়ে ভালোবাসার কথা বলে!


চার.

আলো ও অন্ধকারের মাঝখানে একটা মৃত্যুর কথা বলে গেল চাঁদ!


তোমরা যে প্রকৃত পুরুষের কথা বলো, যে নারীর কথা বলো,


তারা আসলে ক্ষতবিক্ষত স্থানের কাল্পনিক চরিত্র সব!


আর বাকি কথা রইলো যেটা, সেটা হলো ‘মানুষশব্দের আগে 'ধান্দাবাজ' কথাটা বসাটাই আমার শ্রেয় মনে হয়!


পাঁচ.

নিজের চিতায় নিজের দেহ পুড়ছে দেখে পালিয়ে আসতে চাইছে নিম গাছ


জীবন এমনই একটা ধন্বন্তরি ধনুক,


বাঁকতে পারি কিন্তু ভেঙে পড়বো না


সে বেঁচে থাকার স্বাদ যতই তেতো হোক!


সত্যজিৎ রজক -এর কবিতা গুচ্ছ

ওয়াকিং ডিসট্যান্স

এপ্রিল ২০২১